প্রতিবাদের মুহূর্ত
.............................
.............................
বাংলাদেশে গত এক বছরে খুন হয়েছেন একের পর এক মুক্তমনা। এদের মধ্যে কেউ ব্লগার, কেউ অধ্যাপক, কেউ পত্রিকার সম্পাদক, কেউ আবার মানবাধিকার কর্মী। একই ঘটনা ঘটেছে, ঘটে চলেছে ভারত, পাকিস্তানেও।
ইদানীংকালে ভারতে গোবিন্দ পানসারে, এম এম কালবুরগী ও নরেন্দ্র দাভলকার হিন্দু মৌলবাদীদের হাতে খুন হন। খুব সম্প্রতি, পাকিস্তানে তালিবানি হামলায় মৃত্যু হয়েছে মানবাধিকার কর্মী খুরাম জাকি ও সাংবাদিক রাও খালিদের। এর আগেও পাকিস্তানে এমন ঘটনা ঘটেছে। যদিও বাংলাদেশের পরিস্থিতি অন্য দুটি দেশের তুলনায় আরও বেশি ভয়াবহ।
এসব বন্ধ হওয়ার সেভাবে কোনো পূর্বাভাসও এই মুহূর্তে নেই।
উপমহাদেশ জুড়ে এই উগ্র মৌলবাদী হিংসার বাড়বাড়ন্তে আমরা (মানে, যুক্তিবাদী-মানবতাবাদীরা) উদ্বিগ্ন। আরও উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলি মৌলবাদী হিংসা প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। এর ফলে প্রকারান্তরে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে অন্ধ হিংস্র মৌলবাদীদেরই। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও হিংসা যে হারে বাড়ছে, তাতে ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে মুক্তচিন্তার পরিসর। এই পরিস্থিতি কেবল নাগরিকের নিরাপত্তা নয়, মানবসমাজের সার্বিক বিকাশের পক্ষেও ভীষণ বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর।
বস্তুত, ইদানীংকালে ভারত, পড়শি পাকিস্তান ও বাংলাদেশে যেভাবে মুক্তমনা, যুক্তিবাদী, এমনকি সাধারণ শিক্ষক, সুফি, সমাজকর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে তাতে আশঙ্কা হয়, গোটা বিশ্বটাই কি ধীরে ধীরে অসহিষ্ণু ও সহিংস মৌলবাদীদের কব্জায় চলে যাচ্ছে?
ভাবলে বিস্ময় লাগে, ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রসংঘের ঘোষিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষর করেছে ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ। সেই সনদের ১৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘প্রত্যেকেরই মতামতের ও মতামত প্রকাশের অধিকার ও স্বাধীনতা রয়েছে; বিনা হস্তক্ষেপে মতামত পোষণ এবং যে কোনো উপায়ে ও রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্বিশেষে তথ্য ও মতামত সন্ধান, গ্রহণ ও জ্ঞাত করার স্বাধীনতা এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত৷’’ অর্থাৎ, ধর্ম-সহ যে কোনো মতে বিশ্বাসের অধিকার যেমন আছে, তেমন অবিশ্বাসের অধিকারও আছে পৃথিবীর যে কোনো নাগরিকের।
এবার ভারতের দিকে তাকান।
ভারতীয় সংবিধানের ১৯ নম্বর ধারাতেও ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’কে স্বীকার করা হয়েছে। সংবিধানের ৫১(এ)(এইচ) অনুচ্ছেদ মোতাবেক, ‘বিজ্ঞানমনস্কতা প্রসার’কে সমস্ত নাগরিকের ‘আবশ্যিক কর্তব্য’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মৌলবাদী চিন্তা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, হিংসা ইত্যাদি যে বিজ্ঞানমনস্কতার একেবারে উল্টো মেরুর বিষয়, সেটা মানতে নিশ্চয়ই কারও আপত্তি হবে না।
ভারতীয় সংবিধানের ১৯ নম্বর ধারাতেও ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’কে স্বীকার করা হয়েছে। সংবিধানের ৫১(এ)(এইচ) অনুচ্ছেদ মোতাবেক, ‘বিজ্ঞানমনস্কতা প্রসার’কে সমস্ত নাগরিকের ‘আবশ্যিক কর্তব্য’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মৌলবাদী চিন্তা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, হিংসা ইত্যাদি যে বিজ্ঞানমনস্কতার একেবারে উল্টো মেরুর বিষয়, সেটা মানতে নিশ্চয়ই কারও আপত্তি হবে না।
তারপরেও, আজকের বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এমন উল্লম্ফনের যুগে বিজ্ঞানমনস্কতা, গণতন্ত্র ও মানবতার উপর এ-হেন মৌলবাদী হামলা কোনও যুক্তিতেই মেনে নেওয়া যায় না। যে কোনও মূল্যে এই ‘হিংসা'কে প্রতিহত করতে হবে। এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে যুক্তি, শুভবুদ্ধি, সহিষ্ণুতা ও মানবতাকে।
বিজ্ঞান ও যুক্তি চর্চার অতিদীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে এই ভারতীয় উপমহাদেশের। সেই ঐতিহ্যকে সুরক্ষিত রাখার দায়বদ্ধতাও আছে এই প্রজন্মের।
বিজ্ঞান ও যুক্তি চর্চার অতিদীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে এই ভারতীয় উপমহাদেশের। সেই ঐতিহ্যকে সুরক্ষিত রাখার দায়বদ্ধতাও আছে এই প্রজন্মের।
মনে রাখতে হবে ভিন্নস্বর, ভিন্নমত না থাকলে মানবসভ্যতা, সংস্কৃতি কোনো দিন এগোত না। কোনোদিন এগোবেও না।
মৌলবাদী হিংসা প্রতিরোধ করতে আমরা অবিলম্বে রাষ্ট্রসংঘের হস্তক্ষেপ দাবি করছি। রাষ্ট্রসংঘ ও সংশ্লিষ্ট দেশের (ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের) সরকারের কাছে আমরা দাবি জানাচ্ছিঃ
১। মানবাধিকার সনদ মোতাবেক, ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত, লিঙ্গ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস নির্বিশেষে সমস্ত নাগরিকের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
১। মানবাধিকার সনদ মোতাবেক, ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত, লিঙ্গ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস নির্বিশেষে সমস্ত নাগরিকের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
২। রাষ্ট্রসংঘের পক্ষ থেকে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান-সহ মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলিকে কড়া বার্তা দিতে হবে, যাতে তারা ‘মানবাধিকার সনদ'কে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক মান্যতা দেয় এবং সনদের নীতি ও বিধিনিষেধ লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত, কার্যকর ব্যবস্থা নেয়।
৩। মুক্তমনা, নাস্তিক, যুক্তিবাদী, মানবাধিকার কর্মীদের, বিশেষত যাদের হুমকির মুখে দিন কাটাতে হচ্ছে, তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে রাষ্ট্রসংঘ ও সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকে।
৪। স্বাধীনতা-হরণকারী ব্যক্তি, সংস্থা বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে হবে রাষ্ট্রসংঘ ও সংশ্লিষ্ট দেশ’কে।
৫। রাষ্ট্রসংঘের নির্দেশ অমান্যকারী দেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে ব্যবস্থা নিতে হবে।
No comments:
Post a Comment