ভোট ভাবনা ২০১৬
১। বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটের ফলাফল পুরোপুরি জনমত প্রতিফলিত করে না। নানা কারণে এই ব্যবস্থায় স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ কম। এখানে মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ দেওয়া হয় না। বরং ধর্ম, জাতপাত, গোষ্ঠী, দেশ ইত্যাদি নানা অজুহাতে মানুষকে নানাভাবে ‘হিসটিরিয়াগ্রস্ত’ করে তোলা হয়। সেই সূত্রে তাদের চিন্তাভাবনাকে পছন্দমতো ‘এক খাতে’ বইয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে। এছাড়া, নানা দলীয় প্রচারের সঙ্গে আবার পুঁজির সম্পর্ক থাকে। সম্পর্ক থাকে কর্পোরেটের। কর্পোরেটের টাকা আর মিডিয়ার সৌজন্যে কোনও দল প্রচারের আলোয় থাকে, অন্যরা থাকে বাইরে। আরও কারণ আছে। (তার মানে অবশ্য এই নয় যে, পুরোপুরি জনমত প্রকাশিত হলে ফলাফল একেবারে উলটে যেত। জামানত জব্দ হয়ে যেত বিজয়ী প্রার্থীদের!)
২। তৃণমূল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে মানে এই নয় যে রাজ্যের মানুষের ‘নিরঙ্কুশ সমর্থন’ তাদের দিকে আছে। বড় জোর এটা বলা যায় যে, 'মন্দের ভাল' দল হিসেবে তারা বাম-কং জোটকে টেক্কা দিয়েছে। সত্যি বলতে, মানুষের সামনে সত্যিকারের ‘অপশন’ কম থাকে, এ বারও তা-ই। ৩-৪’টে দল আর ‘নোটা’র বাইরে ভোটারদের কাছে ‘পছন্দ’ করার মতো আর কী ছিল! তাই জনসাধারণ হয়তো, সাতপাঁচ ভেবে, বাম-কং জোটের চেয়ে টিএমসি’কেই ‘বেশি গ্রহণযোগ্য’ বলে মনে করেছে, যেহেতু কোনও বিকল্প নেই, ছিলও না তাদের হাতে। এ সেই একদা বামেদেরই প্রচারিত ‘তুলনামূলক গ্রহণযোগ্যতার তত্ত্ব’! এক সময় বামেরা তাদের ক্রমহ্রাসমান বিশ্বাসযোগ্যতা ঢাকতে এই তত্ত্ব দিয়েছিল। এখন সেই তত্ত্বের ফলভোগ করছেন মমতা। ভাগ্যের, থুড়ি, ইতিহাসের কী নিদারুণ পরিহাস!
৩। সিপিএমের পরাজয় হয়েছে মানে মানুষ ‘বামপন্থা’ বা ‘মার্ক্সবাদ’কে প্রত্যাখ্যান করেছে, তা নয়। মানুষ আসলে ‘সুবিধাবাদ'কে বর্জন করেছেন। অনেকেই বলছেন, ‘দুর্নীতি’ কোনো ইশ্যু হতে পারেনি। এটা খুবই উদ্বেগের। কিন্তু আমার ধারণা, ‘দুর্নীতি’ সম্পর্কেও জনসাধারণ সচেতন ছিলেন। আসলে সুবিধাবাদের গর্ভেই তো দুর্নীতির জন্ম হয়। মানুষ সম্ভবত, টিএমসি-র সুবিধাবাদ/দুর্নীতি’র চেয়েও বাম-কংগ্রেসের ‘সুবিধাবাদ’কে বেশি বিপজ্জনক বলে মনে করেছেন।
৪। এ রাজ্যের মানুষ যখন কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না বা যখন নির্ভরযোগ্য 'বিকল্প' খুঁজে পান না, তখন 'স্থিতাবস্থা'তেই সায় দেন। অর্থাৎ, নেতিবাচক ভোটে ফলাফল নির্ধারিত হয়। অতীতে বহুবার বামেরা এই 'স্ট্যাটাসকো'র সুবিধা পেয়েছে। এবার পেয়েছে তৃণমূল, এই যা।
৫। ‘নোটা'য় ১.৫ পারসেনট ভোট পড়েছে। নোটার পক্ষে সরকারি, বেসরকারি কোনও স্তরেই প্রচার ছিল না। বরং উলটোটাই ছিল। তা সত্ত্বেও কম-বেশি ১০ লক্ষ মানুষ সমস্ত দল ও প্রার্থীকে বর্জন করেছে। ‘নোটা'র ভোটগুলো ছিল প্রতিনিধিত্বমুলক। অর্থাৎ এর ১০/২০/৩০ গুণ মানুষ মনে মনে 'নোটা' ভোট দিয়েছেন। এর সঙ্গে যদি যারা 'ভোট দেননি' বা 'ভোট বয়কট করেছেন'-দের যোগ করা যায়, তাহলে সংখ্যাটা খুব কম হবে না।
৬। বয়কটের ভোট+ নেতিবাচক ভোট + নোটা-- এই সব হিসেবের মধ্যে আনলে বলা যায়, মানুষ আসলে জয়ী, পরাজিত নির্বিশেষে সব দল'কেই একটি সাধারণ বার্তা দিয়েছেন... সেই বার্তা সংস্কারের, সংশোধনের, বিকল্পের।
এখন কথা হল, জনসাধারণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের রাজনৈতিক ‘বারতা’কে দলগুলো গুরুত্ব দেবে কি না। তারা কি নিজেদের সংশোধন করবে? পালটাবে? নাকি তাদের যেমন বেণী তেমনি রবে? সে ক্ষেত্রে মানুষ কেই তার ‘বিকল্প সিদ্ধান্ত’ ‘নির্মাণ’ করতে হবে। সেটা তারা করবেন কি না, তা ভবিষ্যৎই বলবে...
No comments:
Post a Comment