Tuesday, November 3, 2015

গরু শুয়োরের রাজনীতি

গরু-শুয়োরের রাজনীতি প্রসঙ্গে...১। এটা ঠিকই যে, খাদ্যাভ্যাস দিয়ে মানুষের ‘প্রগতিশীলতা’ মাপা যায় না। গরু বা শূকরের মাংস খেলেই খুব এক চোট প্রগতিশীলতা হল, আর না খেলেই তা হয়ে গেল মান্ধাতার বাবার আমলের স্টাইল স্টেটমেন্ট, এমনটা মোটেই নয়।২। কে কী খাবে বা পরবে (বা, পড়বে), তা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এব্যাপারে অন্যদের হস্তক্ষেপ না করাই বাঞ্ছনীয়।৩। গো মাংস সংক্রান্ত বিতর্ক’টা অনেকটা ওই ‘স্কুলে মেয়েরা শালোয়ার না শাড়ি পরবে’ বিতর্কের মতো, এবং অবশ্যই হাস্যকর।৪। আবার এ কথাও সত্যি, গো মাংস নিয়ে একটা ‘রাজনীতি’ হয়, এবং আবারও হচ্ছে। এটা হল ভোট ব্যাংকের রাজনীতি। ‘মুসলিম ভোট’ কবজা করার কৌশল হিসেবেই রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের মদতদাতারা এই রাজনৈতিক খেলাটা খেলছে। এটা হল ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি।৫। যারা গোমাংসের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিচ্ছে, তারা ‘হিন্দু ভোট’ টানতে চায়। যেমন শিবসেনা, বিজেপি ও তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা। আর যারা তার বিরোধিতা করছে, তারা চাইছে ‘মুসলিম ভোট’ টানতে। এ দিকে আছে, তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো। এই কারণেই গোমাংসের প্রশ্নে এক-ঘাটে মাংস চিবোতে দেখা যাচ্ছে সিপিএম-তৃণমূলকে (থুড়ি, বিকাশ-সুবোধ’কে)।৬। গোমাংস খাওয়া নিয়ে কেউ ফতোয়া দিলে, তার বিরোধিতায় অযুক্তি বা অন্যায় কিছু নেই। যে কোনো ফতোয়ার বিরুদ্ধে কথা বলার ব্যাপারে যুক্তিবাদী, মুক্তচিন্তার মানুষদের আপত্তি থাকবে কেন? বরং, এটা তারা সচেতনভাবে সমর্থন করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু ওই, ‘সচেতনভাবে’!৭। এ দেশের প্রায় সব দল (‘প্রায়’ কথাটা নিছক আলংকারিক!) মৌলবাদের সঙ্গে আপস-রফা করে চলে, এটা দিনের আলোর চেয়েও স্পষ্ট। এরা ভোট রাজনীতির বাধ্যবাধকতা থেকে যখন গো-রাজনীতি করে, তখন তাদের অংক গুলিয়ে দিতে গরু’র পাল্টা শূকরের প্রসঙ্গটা তোলা যেতেই পারে। অন্য কোনো কারণে নয়, স্রেফ তাদের ভণ্ডামি’টা ফাঁস করে দিতে। অর্থাৎ, গোমাংস ভক্ষণের পাল্টা হিসেবে যারা শূকরের মাংস ভক্ষণের চ্যালেঞ্জ ছুড়ছেন, আমি তাদের পক্ষে।৮। আর একটা জরুরি কথা। এমনিতে ‘আপ রুচি খানা...’র তত্ত্ব ঠিকই আছে। আমিষ-নিরামিষ পছন্দ নিয়েও আপত্তির কোনো কারণ দেখি না। কিন্তু বন্ধু, অনেকেই ‘আপ রুচি খানা...’র তত্ত্বের আড়ালে নিজের আবাল্যলালিত সংস্কার ঢেকে রাখতে চায়, এহেন উদাহরণও কিন্তু কম নয়। একইসঙ্গে ‘সংস্কার’ ও ‘প্রগতিশীলতা’কে সুরক্ষিত রাখার কৌশল হিসেবে তারা মানুষের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, বাস্তবতা, রুচি, খাদ্যাভ্যাস, আমিষ-নিরামিষের গুনাগুণ, জনস্বাস্থ্য, গোপালনের (শূকর পালন নিয়েও হয়তো কেউ বলে, আমি শুনিনি) উপযোগিতা ও আবশ্যিকতা, নির্বিচারে প্রাণীহত্যার কুফল, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যে ব্যাঘাত ইত্যাদি প্রশ্ন (পড়ো, আপত্তি) তোলেন। এটা ‘আত্মপ্রবঞ্চনা’ কি না, ভেবে দেখতে হবে। (এ কথাগুলো খানিকটা আমি নিজের উদ্দেশেই বললাম!)৯। এটা ঠিকই যে, ‘সংস্কার’ পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যায় না। প্রবল মেধাবী, প্রতিভাধর’রাও তা পারেন না। তবে নিজের অজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে সচেতন থাকা উচিত। নিজেকে আগমার্কা প্রগতিশীল হিসেবে জাহির করা বাঞ্ছনীয় নয়।১০। শেষে একটাই ঘোষণাঃ নিজের অজ্ঞতা ও সংস্কারকে ‘বিজ্ঞান ও যুক্তি’সম্মত বলে চালানোটা আমাদের কাজ নয়। বরং, নিজের মনে জমে থাকা ‘অজ্ঞতা ও সংস্কার’-এর জঞ্জাল সাফ করাটাই আমাদের আসলি লড়াই...

No comments:

Post a Comment